‘সেদিন বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল ছোঁয়ার’
মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো বগুড়া শহরের বিট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা ছোঁয়াকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার পরিবার। প্রিয় সন্তানকে হারানোর শোকে কাতর বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, একটি সন্তান হারানোর জ্বালা শুধু সে-ই বোঝে, যার সন্তান হারিয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টায় বীট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে ছোঁয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত দোয়া মাহফিলে উপস্থিত হয়ে নিজের বুকফাটা বেদনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, একটা সন্তান হারানোর জ্বালা যে কত, বুকে পাথর বেঁধে তিনদিন ধরে আমি বাড়িতেও থাকতে পারি না, বাইরেও থাকতে পারি না। আজকে আমার দুঃখের দিন। কোথায় যাব? আমার বুকের জ্বালা, আমার কলিজার টুকরা আমার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছে। এর থেকে বড় জ্বালা আমার আর নাই, আমি সহ্য করতে পারতেছি না।
মেয়েকে হারানোর শোক সামলাতে না পেরে তিনি আরও বলেন, সামনের একটি সভায় এই স্কুলে উপস্থিত হয়ে তার কিছু বলার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই তার কলিজার টুকরা তাকে ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছে। কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন তার মেয়ের মতো আর খালি না হয় এমন আকুতি জানান তিনি।
দোয়া মাহফিলে মেয়েকে ঘিরে নানা স্মৃতিচারণ করে শোকাহত বাবা জানান, তার বড় ছেলে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে বর্তমানে সরকারি আজিজুল হক কলেজে অনার্সে পড়ছেন। মেয়ের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধার কথা ভেবেই ছোঁয়াকে বিট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করেছিলেন তিনি।
আদরের মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, আমার মেয়েটা গোসলের পর সে কাপড় পর্যন্ত নিজে নেড়ে দিত না, তার মা নেড়ে দিত। এত শখের মেয়ে আমার।
মৃত্যুর দিনের শেষ স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, সেদিন বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল ছোঁয়ার। খাতা কিনে দেওয়ার আবদারও করেছিল সে। মেয়ের ছোট ছোট ইচ্ছা পূরণ করতে বাবা প্রায়ই তার জন্য ৬ থেকে ১২ দিস্তা খাতা ও ডজন ডজন কলম এনে দিতেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে নিহত শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, অভিভাবকদের কাছ থেকে নিয়মিত সেশন ফি ও গাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের।
তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবহনে দক্ষ ও দায়িত্বশীল চালক নিয়োগ এবং মানসম্মত ও নিরাপদ যানবাহন ব্যবহারের দাবি জানান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং কার্যকর ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে উপস্থিত সবার কাছে তার আদরের ছোট মেয়ের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়ে কানিজ ফাতেমা ছোঁয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া প্রার্থনা করেন শোকাহত বাবা।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে বগুড়া শহরের বিসিক এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফেরার পথে পল্লীমঙ্গল ইটভাটার কাছে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে সাইড দিতে গিয়ে স্কুলটির বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই কানিজ ফাতেমা ছোঁয়া মারা যায় এবং আহত হন অন্তত ১০ জন।
নিহত কানিজ ফাতেমা ছোঁয়া বগুড়া শহরের বিট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং খামারকান্দি পশ্চিমপাড়া এলাকার শফিকুল ইসলামের মেয়ে।
আয়োজিত দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. সাহাবুদ্দীন সৈকত, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।
প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে এক বাবার হৃদয়বিদারক আহাজারিতে দোয়া মাহফিলের পরিবেশও হয়ে ওঠে ভারী ও শোকাবহ।