কাহালুর পাঁচখুর গ্রামের প্রায় শতভাগ পরিবারের জীবন গাঁথা হস্তশিল্পে
মুনসুর রহমান তানসেন, কাহালু (বগুড়া)
জীবন জীবিকার ত্যাগিদে পূর্বসুরীদের পেশা ছেড়ে পরিবর্তিত পেশায় এখন অনেকেই। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় প্রায় সবখানেই । পরিবর্তিত সময়ের আবহে এখনো বগুড়ার কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নের পাঁচখুর গ্রামের প্রায় শতভাগ পরিবারের সদস্যরা তাদের বাপ-দাদার আদি পেশা বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির হস্তশিল্পের কাজকে স্বগৌরবে ধরে আছেন আঁকড়ে।
সরোজমিনে দেখা গেছে, পূর্বসুরীদের রেখে যাওয়া এই হস্তশিল্পের কাজকে তারা বংশ পরম্পায় করেছেন আরও উন্নত। তালগাছের ঢিঙ্গা পানিতে পচিয়ে সেখান থেকে আঁশ বের করে তৈরি করা হচ্ছে নানা প্রকারের সৌখিন জিনিসপত্র। আগে তারা পচা ঢিঙ্গা থেকে হাত দিয়ে আঁশ বের করতো; এখন আঁশ বের করা হচ্ছে মেশিন দিয়ে। সেই সাথে তালগাছের ঢিঙ্গার আঁশের পাশাপাশি সৌখিন জিনিসপত্র তৈরিতে নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে কচুরিপানার ডাটা, ছনপাতা, সন্ধ্যাপাতা ও বিছানা তৈরির পাতি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে লোকজ ঐতিহ্য ঠিক রেখেই হস্তশিল্পের এই কাজকে তারা নিয়ে গেছেন আরও উচ্চতায়। ক্রেতাদের দেওয়া ডিজাইনে সৌখিন জিনিসপত্র তৈরিতেও এখন এই গ্রামের হস্তশিল্পীরা অনেক বেশি পারদর্শী। দক্ষতার সাথে হস্তশিল্পের কাজ করায় এখানেই সৌখিন জিনিসপত্র কিনতে ছুঁটে আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংস্থা। যার ফলে এই গ্রামের হস্তশিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় নিখুঁতভাবে তৈরি কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্র এখন দেশ-বিদেশ পর্যন্ত সমাদৃত।
হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প বঙালি জাতির লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ অংশ। বাঙালি প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের গল্প, কবিতা কাব্য ও উপন্যাস পড়লে বাঙালির হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ও হস্তশিল্প বাঙালি সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে হাজার বছর ধরে। বাংলার বিভিন্ন জনপদ ঘুরলেই অনুমান করা যায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই এই কাজ এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। কাজের মূল্যায়ণের অভাবে এই হস্তশিল্পের কাজ কোথাও বিলুপ্তির পথে। আবার কোন কোন এলাকার মানুষ এই কাজেই দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে নিজ এলকার সুনাম ছড়িয়ে দিয়েছে দেশ-বিদেশে। এই জনপদের তেমনি একটি গ্রাম পাঁচখুর। কুটির শিল্পের সৌখিন জিনিসপত্রের মাধ্যমেই এই গ্রামের পরিচিতি এখন অনেক মানুষের কাছে।
এখানে তৈরি কুটির শিল্পের জিনিসপত্র শখের বশে ব্যবহারের পাশাপাশি এখন ধনী-গরীবসহ অনেকের সাংসারিক কাজেও রীতিমত ব্যবহার করা হচ্ছে। শখের বশে কেউ সৌখিন জিনিসপত্র ঘরে সাজিয়ে রাখছেন আবার অনেকের নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করছেন। সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের উপযোগী করেই এখানকার হস্তশিল্পীরা দক্ষতার সাথে কুটির শিল্পের জিনিসপত্র তৈরি কররেছন। প্রকারভেদে প্রায় অর্ধশত প্রকারের জিনিসপত্র তৈরি হয় এই পাঁচখুর গ্রামে। এখানকার তৈরিকৃত উল্লেখযোগ্য জিনিসপত্রের মধ্যে রয়েছে ঝুড়ি, টুপি, সাহেবী টুটি, রাজা-রাণীর টুপি, ফুলদানী, ডালা সেট, টেবিল মাট, সালেন্ডার, পান ডাবরী, মগ সেট, সেলাই ঝুড়ি, পদ্ম ঝুড়ি, বাকের ঝুড়ি, ইলেকট্রিক বাল্প ঢাকনা, ভি চান্দি, এস চান্দি ও দুই বাকের মাটসহ আরও অনেক সৌখিন জিনিসপত্র। তৈরিকৃত জিনিসপত্র প্রকারভেদে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য।
এখানকার হস্তশিল্পীরা জানান, কয়েক বছর আগে তাদের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা শুধু বগুড়া জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই সময় নিজ জেলায় কুটির শিল্পের জিনসপত্রের চাহিদা থাকলেও অন্য এলাকার ক্রেতারা এখানে আসতো না। নিজ জেলায় চাহিদা থাকলেও সেটা সাধারণত কোনো উৎসবকে ঘিরে । যেমন পহেলা বৈশাখ, ঐতিহ্যবাহী মেলা, পূজা-পার্বন ও বাঙালির কিছু উৎসব ঘিরে তাদের কুটির শিল্পের সামান্য কিছু জিনিসপত্র বিক্রি হতো। কুটির শিল্পের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এই গ্রামের অনেকেই বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তারা ক্রেতার চাহিদা মাফিক ডিজাইনে অনেক সৌখিন জিনিসপত্র তৈরিতে পারদর্শী হয়ে উঠেন।
তথ্যমতে, প্রশিক্ষিত হস্তশিল্পীদের মাধ্যমেই এখানে তৈরি কুটির শিল্পের জিনিসপত্রের মান আগের চেয়ে অনেক বেশি ভালো। ভালো মানের জিনিসপত্র পাওয়া যায় বলেই এখানে বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা ছুঁটে আসেন। দিন যতই যাচ্ছে ততই চাহিদা বাড়ছে এখানকার তৈরি জিনিসপত্রের। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছের ঢিঙ্গার আঁশের পাশাপাশি কুটির শিল্পের কাজে এখন তারা কচুরিপানার ডাটা, ছনপাতা, সন্ধ্যাপাতা, বিছানা তৈরির পাতির ব্যবহারও করছেন। কুটির শিল্পের জিনিসপত্র বিক্রির জন্য এখন আগের মত কোনো উৎসবের আশায় বসে থাকতে হয়না এই গ্রামের হস্তশিল্পীদের। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের চাহিদা পুরুণে সারা বছরই এখানে চলে কুটির শিল্পের কাজ। হস্তশিল্পের কাজের মাধ্যমেই পাঁচখুর থেকে কুটির শিল্পের গ্রাম হিসাবেই এই গ্রামের পরিচিতি এখন সবখানে।
হস্তশিল্পী শাপলা খাতুন, নাসরিন আক্তার জানান, কুটির শিল্পের কাজে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকায় ক্রেতাদের দেওয়া ডিজাইনে জিনিসপত্র তৈরি করার ক্ষেত্রে তাদের কোন সমস্যা হয়না। তাদের জিনিসপত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা তালগাছের ঢিঙ্গার আঁশ ব্যবহারের পাশাপাশি কচুরিপানার ডাটা, ছনপাতা, সন্ধ্যাপাতা ও বিছানা তৈরির পাতিও তাদের এই কাজে ব্যবহার করছেন। তাদের মতে, এখানে তৈরি কুটির শিল্পের জিনিসপত্র এখন বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
গৃহবধু রেশমা খাতুন, জানান, এই গ্রামে যারা নববধু হিসেবে এসেছেন, তারা শ্বশুড়ালয়ে এই কুটির শিল্পের কাজটিই প্রথমে শিখে ফেলেন। আর যাদের জন্ম এই গ্রামে তারা শিশুকাল থেকেই এই কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেন। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ভিতর অথবা বাড়ির উঠানে চোখ রাখলেই দেখবেন শিশু থেকে শুরু ৮০ বছরের বৃদ্ধ মানুষ পর্যন্ত হস্তশিল্পের কাজ করছে। এই কাজ করেই এই গ্রামের প্রায় প্রতিটির বাড়ির একজন দুজন পুরুষ মানুষ বিদেশে গেছেন। তারা বিদেশে গেলেও তাদের বাড়িতে কুটির শিল্পের কাজ চলমান রেখেছেন নারীরা।
এই গ্রামের লুৎফুন নাহারের বয়স এখন ৭৫ বছর। বাড়ির উঠানে বসে হস্তশিল্পের কাজ করছেন তিনি। লুৎফুন নাহার জানান, তিনি নববধু হয়ে এই গ্রামে আসার পর থেকেই সকলের দেখাদেখি এই কাজ তিনি নিজেও শুরু করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাড়ির টুকিটাকি কাজের পাশাপাশি এই কাজও তিনি করছেন।
এ ব্যাপারে কাহালু উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাশপিয়া তাসরিন এঁর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলা হলে তিনি জানান, বিষয়টি আমার জানা ছিল না, আপনার মাধ্যমে জানলাম। হস্তশিল্পীদের খোজ খবর নিয়ে নিয়ে দেখবো।